জলি আক্তার
ভোরের আলো ফোটার আগেই এদেশের শহর ও মফস্বলের কর্মব্যস্ত মানুষের দিন শুরু হয়। ঘড়ির কাঁটার সাথে পাল্লা দিয়ে শুরু হওয়া এই দৌড় থামে গভীর রাতে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একজন কর্মজীবীর জীবন মানেই কেবল একটি পেশা নয়, বরং এক নিরন্তর লড়াই—বেঁচে থাকার, টিকে থাকার এবং স্বপ্ন পূরণের। তবে এই লড়াইয়ের আড়ালে যে জীবন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, তা আজ গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে।
বাংলাদেশের কর্মজীবী বিশেষ করে শহুরে মধ্যবিত্তের জীবনের সিংহভাগ সময় কেড়ে নেয় যানজট। রাজধানী ঢাকার কথাই ধরা যাক; একজন কর্মজীবীকে দিনে গড়ে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা সময় কাটাতে হয় পাবলিক বাস কিংবা জ্যামে আটকে থাকা যানবাহনে। এই দীর্ঘ অপেক্ষা শুধু শারীরিক ক্লান্তিই আনে না, বরং কর্মক্ষমতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। যাতায়াতের এই ভোগান্তি শেষে যখন একজন কর্মী দপ্তরে পৌঁছান, তখন প্রাণশক্তির এক বড় অংশই নিঃশেষ হয়ে যায়।
বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে কর্পোরেট সংস্কৃতিতে কর্মঘণ্টার কোনো সুনির্দিষ্ট সীমারেখা নেই। ল্যাপটপ আর স্মার্টফোনের কল্যাণে অফিস এখন শোবার ঘর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। ফলে ‘ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্স’ বা কর্ম ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখা এদেশের মানুষের জন্য একটি বিলাসবহুল শব্দে পরিণত হয়েছে। পরিবারকে পর্যাপ্ত সময় দিতে না পারার এক ধরনের সুপ্ত অপরাধবোধ কাজ করে অনেকের মধ্যেই। বিশেষ করে নারী কর্মজীবীদের জন্য এই চ্যালেঞ্জ দ্বিগুণ। তাঁদের একদিকে যেমন পেশাদারিত্বের প্রমাণ দিতে হয়, অন্যদিকে ঘর ও সন্তানের দায়িত্ব সামলাতে হয় নিপুণভাবে। এই ‘ডাবল শিফট’ পালনের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাব আজও প্রকট।
অর্থনৈতিক বাস্তবতায় মুদ্রাস্ফীতি আর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি কর্মজীবীদের জীবনকে আরও সংকুচিত করে ফেলেছে। মাস শেষে প্রাপ্ত বেতনের অঙ্কটা যখন বাজারের ফর্দ আর বাড়ি ভাড়ার হিসাবের কাছে হার মানে, তখন সেই মানসিক চাপ অসহনীয় হয়ে ওঠে। বিনোদনের সুযোগ আমাদের জীবনে সীমিত। পার্কের অভাব, যানজট আর অত্যধিক ক্লান্তির কারণে ছুটির দিনটিও কাটে স্রেফ ঘুমের ঘোরে বা ঘরের কাজে। এই যে একঘেয়েমি, এটি সৃজনশীলতা ও মানবিক বোধকে ক্রমেই গ্রাস করছে।
তবে এত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বাংলাদেশের কর্মজীবীদের লড়াকু মানসিকতা আমাদের আশাবাদী করে। টং দোকানের এক কাপ চা কিংবা সহকর্মীদের সাথে সামান্য আড্ডায় তারা ক্লান্তি ভোলার চেষ্টা করেন। শত প্রতিকূলতার মাঝেও উৎসব-পার্বণে নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা কিংবা সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য অমানুষিক পরিশ্রম করা—এসবই আমাদের কর্মজীবীদের টিকে থাকার জ্বালানি।
সময় এসেছে কর্মজীবীদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং জীবনযাত্রার মান নিয়ে ভাবার। কেবলমাত্র অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে একটি জাতির উন্নয়ন পরিমাপ করা সম্ভব নয়, যদি না সেই প্রবৃদ্ধির কারিগররা সুস্থ ও সুন্দর জীবন যাপন করতে পারেন। সুলভ ও উন্নত গণপরিবহন ব্যবস্থা, কর্মক্ষেত্রে মানবিক পরিবেশ এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে আয়ের সামঞ্জস্য বিধান করা আজ সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের কর্মজীবীরা স্রেফ একটি সংখ্যা বা যন্ত্র নয়; তারা এই রাষ্ট্রের প্রাণশক্তি। তাঁদের জীবনযাত্রাকে সহজ ও আনন্দময় করতে পারলে জাতীয় উৎপাদনশীলতা যেমন বাড়বে, তেমনি গড়ে উঠবে একটি সুখী ও সমৃদ্ধ সমাজ। যান্ত্রিকতা কাটিয়ে আমরা যেন মানুষের মতো বাঁচার পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারি—এটাই হোক আগামীর প্রত্যাশা।
লেখক: নারী উদ্দ্যেক্তা

