জুনাইদ আহমেদ
বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশ আজ নক্ষত্রহীন হলো। যে কণ্ঠটি গত চার দশক ধরে এদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার আর সার্বভৌমত্বের প্রতীক হয়ে গর্জে উঠেছিল, আজ তা চিরতরে স্তব্ধ। বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, বিএনপির চেয়ারপারসন এবং বাংলার মানুষের কাছে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিত বেগম খালেদা জিয়া আর নেই।
তাঁর প্রয়াণে কেবল একটি রাজনৈতিক দলের অভিভাবক বিয়োগ ঘটেনি, বরং অবসান হলো বাংলাদেশের রাজনীতির একটি বর্ণাঢ্য ও কণ্টকাকীর্ণ অধ্যায়ের।
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আসা ছিল অনেকটা নাটকীয় এবং পরিস্থিতির প্রয়োজনে। একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার সুকঠিন দায়িত্বে আসীন হওয়া—এই দীর্ঘ যাত্রায় তিনি ধৈর্য, সাহস এবং আপসহীনতার যে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবরণের পর যখন দল এবং দেশের ভাগ্য অনিশ্চয়তার মুখে, তখন তিনি শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে রাজপথে নেমে এসেছিলেন।
নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ছিল কিংবদন্তিতুল্য। এরশাদবিরোধী দীর্ঘ ৯ বছরের সংগ্রামে তিনি কখনো মাথা নত করেননি, কোনো প্রলোভনের কাছে আপস করেননি। সেই অকুতোভয় সংগ্রামের কারণেই তিনি বাংলার মানুষের কাছে পরিচিতি পান ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি যখন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন, তখন তা কেবল তাঁর ব্যক্তিগত বিজয় ছিল না, ছিল গণতন্ত্রকামী মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।
তাঁর শাসনামলে বাংলাদেশে নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়নে যে নীরব বিপ্লব ঘটেছিল, তা আজও এদেশের উন্নয়নের ভিত্তি হয়ে আছে। মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষা ও উপবৃত্তি চালুর মাধ্যমে তিনি ঘরে ঘরে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিয়েছিলেন। তাঁর সময়ে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও কৃষি ক্ষেত্রে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, তা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন এনেছিল।
তবে বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের শেষ অধ্যায়টি ছিল অত্যন্ত বিষাদময়। কারাবরণ, নিঃসঙ্গতা আর দীর্ঘ অসুস্থতার সঙ্গে ছিল তাঁর লড়াই। গত কয়েক বছর ধরে হাসপাতালের চার দেয়ালের মাঝে যখন তিনি জীবনের শেষ দিনগুলো পার করছিলেন, তখন দেশের কোটি কোটি ভক্ত-অনুরাগী তাঁর সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করেছেন। বার্ধক্য আর অসুস্থতার কাছে হার মেনে তিনি আজ চলে গেলেন ওপারে, যেখানে কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নেই, নেই কোনো জেল-জুলুমের ভয়।
রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকবেই, কিন্তু বেগম খালেদা জিয়ার দেশপ্রেম আর জনগণের প্রতি তাঁর মমত্ববোধ নিয়ে তর্কের অবকাশ নেই। তিনি ছিলেন সাধারণ মানুষের একজন, মানুষের স্পন্দন বুঝতেন। লাল-সবুজের পতাকার মান রাখা এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে তিনি সবসময়ই ছিলেন আপসহীন।
একটি যুগের অবসান হলো। বাংলাদেশের রাজনীতির মানচিত্র থেকে একটি বিশাল বটবৃক্ষ আজ পড়ে গেল। যে শূন্যতা তৈরি হলো, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।
বেগম খালেদা জিয়া চিরকাল বেঁচে থাকবেন তাঁর কর্মে, তাঁর আদর্শে এবং এদেশের মানুষের হৃদয়ে। হে আপসহীন নেত্রী, আপনি শান্তিতে ঘুমান। বাংলাদেশ আপনাকে ভুলবে না।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

