আওয়াল আহমেদ
রাজধানীর শাহবাগ আবার উত্তাল, তরুণদের স্লোগানে প্রকম্পিত হচ্ছে রাজপথ। ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদির অকাল ও নিষ্ঠুর মৃত্যু নারী শিশুসহ দেশের সাধারণ মানুষকে আজ রাস্তায় নামতে বাধ্য করেছে। কিন্তু এই বিক্ষোভের আগুন যখন জ্বলছে, তখনই সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে এক চরম উদ্বেগজনক খবর—হাদিকে সরাসরি গুলি করা ব্যক্তি সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতে পালিয়ে গেছে।
হাদি হত্যার পর থেকেই বিচার দাবিতে সরব হয়ে উঠেছিল ছাত্র-জনতা। শাহবাগের অবরোধ সেই দাবিরই বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু ঘাতকের পালিয়ে যাওয়ার খবরটি আন্দোলনকারীদের মধ্যে ক্ষোভের আগুন আরও উসকে দিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, যখন একটি হত্যাকাণ্ডের পর সারাদেশে তোলপাড় শুরু হয়, তখন একজন চিহ্নিত অপরাধী কীভাবে দেশের সীমান্ত পেরিয়ে নিরাপদে অন্য দেশে চলে যায়? এটি কি আমাদের আইনশৃঙ্খলা ও সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারির ব্যর্থতা নয়?
এখন প্রশ্ন হলো, সরকার এখন কী করছে বা কী করবে? ঘাতক দেশের বাইরে পালিয়ে যাওয়ায় বিচার প্রক্রিয়া এখন এক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। কেবল দেশের অভ্যন্তরে চিরুনি অভিযান চালালেই এখন আর হবে না, বরং সরকারকে এখন কূটনৈতিক পথে হাঁটতে হবে। ভারতের সাথে বাংলাদেশের ‘প্রত্যর্পণ চুক্তি’ রয়েছে। সরকারের চেষ্টা করা উচিত সেই চুক্তি ব্যবহার করে দ্রুততম সময়ে ঘাতককে দেশে ফিরিয়ে আনা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এখন সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। দিল্লিতে বাংলাদেশ দূতাবাসকে সক্রিয় করে ইন্টারপোলের মাধ্যমে বা সরাসরি দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে ঘাতককে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করা সময়ের দাবি।
শাহবাগের অবরোধকারীদের মূল সংশয় ঠিক এখানেই। অতীতে দেখা গেছে, প্রভাবশালী বা রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় পাওয়া অপরাধীরা বিদেশে পালিয়ে গিয়ে বছরের পর বছর ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। হাদি হত্যার ক্ষেত্রেও যেন তেমনটি না ঘটে। সরকার যদি ঘাতককে ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না নিতে পারে, তবে জনগণের মধ্যে আস্থার সংকট আরও ঘনীভূত হবে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তারা অপরাধীকে ধরার চেষ্টা করছে এবং তাকে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। তবে শাহবাগের মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের কাছে কেবল ‘চেষ্টা করছি’—এমন আশ্বাস যথেষ্ট নয়। তারা চায় সুনির্দিষ্ট সময়সীমা এবং দৃশ্যমান পদক্ষেপ। কোনো অবস্থাতেই যেন হাদি হত্যার বিচার ফাইলবন্দি হয়ে না থাকে।
একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে যখন নাগরিকরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে এবং ঘাতকরা পার পেয়ে যায়, তখন রাষ্ট্রের মূল স্তম্ভগুলো নড়বড়ে হয়ে পড়ে। হাদি হত্যার বিচার হওয়া কেবল একটি পরিবারের সান্ত্বনা নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের জন্য একটি পরীক্ষা। সরকার যদি সত্যিই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারবদ্ধ হয়, তবে ভারতের সাথে আলোচনা করে অতি দ্রুত ঘাতককে ফিরিয়ে এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
শাহবাগের এই গর্জন কেবল হাদির জন্য নয়, এটি বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এক সম্মিলিত হুঙ্কার। ঘাতক পালিয়ে গিয়ে বাঁচতে পারবে না—সরকারকে তার কর্মতৎপরতার মাধ্যমে এই সত্যটি প্রমাণ করতে হবে। যত দ্রুত অপরাধীকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যাবে, তত দ্রুত রাজপথের ক্ষোভ প্রশমিত হবে এবং মানুষ ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা ফিরে পাবে।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

