আওয়াল আহমেদ
দীর্ঘ ১৭ বছরের প্রবাস জীবন শেষে বাংলাদেশে ফিরছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তাঁর এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তন কেবল একজন রাজনৈতিক নেতার ঘরে ফেরা নয়, বরং এটি সমসাময়িক বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বড় ধরনের বাঁকবদল এবং নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত বাংলাদেশে তারেক রহমানের ফেরা এবং আসন্ন ফেব্রুয়ারি মাসের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এখন আবর্তিত হচ্ছে দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপথ।
প্রত্যাবর্তনের গুরুত্ব ও রাজনৈতিক প্রভাব
২০০৮ সাল থেকে লন্ডনে অবস্থান করা তারেক রহমান দীর্ঘ সময় ধরে ভার্চুয়ালি দলের নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন। প্রতিকূল সময়েও দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং দূরদেশ থেকে তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করার যে মুন্সিয়ানা তিনি দেখিয়েছেন, তা রাজনৈতিক মহলে আলোচিত। এখন সশরীরে তাঁর উপস্থিতি বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন প্রাণের সঞ্চার করবে, যা নির্বাচনী প্রচারণায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবারের নির্বাচনে বিএনপি যে প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
নির্বাচন ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনটি হবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের অন্যতম চ্যালেঞ্জিং মুহূর্ত। গত দেড় দশকের রাজনৈতিক স্থবিরতা এবং সংঘাতময় পরিস্থিতির পর একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য বড় এক পরীক্ষা। তারেক রহমানের ফিরে আসা এই নির্বাচনী উত্তাপকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা ও আগামীর চ্যালেঞ্জ
৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশের তরুণ সমাজ যে ‘নতুন বাংলাদেশের’ স্বপ্ন দেখেছে, সেখানে ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের গুরুত্ব বেশি। তারেক রহমান এমন এক সময়ে ফিরছেন যখন দেশের মানুষ কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোর সংস্কার চায়। বিএনপি এরই মধ্যে ‘৩১ দফা’ সংস্কার প্রস্তাবনা দিয়ে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, তারেক রহমান তাঁর নেতৃত্বে পুরোনো ধারার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণে কতটা সফল হন।
তবে এই উজ্জ্বল সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু অন্ধকার মেঘও রয়েছে। সম্প্রতি বিক্ষিপ্ত সহিংসতা এবং গণমাধ্যমের ওপর হামলার ঘটনাগুলো একটি স্থিতিশীল গণতন্ত্রের পথে অন্তরায়। গণতন্ত্র কেবল ভোট দেওয়ার নাম নয়, বরং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করাই এর মূল লক্ষ্য। তারেক রহমান এবং তাঁর দলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং প্রতিহিংসার রাজনীতির বদলে সহনশীলতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করা।
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন এবং আসন্ন নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন ভোরের সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে। তবে এই যাত্রা মসৃণ নয়। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের এই কণ্টকাকীর্ণ পথে রাজনৈতিক দল, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং সাধারণ নাগরিক—সব পক্ষকে ধৈর্য ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হবে। তারেক রহমান কি পারবেন ছাত্র-জনতার আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ উপহার দিতে? সময় এবং আসন্ন নির্বাচনই এর উত্তর দেবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, বাংলাদেশের রাজনীতির কম্পাস এখন তাঁর ফেরার দিকেই তাকিয়ে আছে।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

