মো. সোহরাব খান
ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খনন, স্বাস্থ্য কাডের্র মতো জনবান্ধব অনেক প্রতিশ্রুতির মধ্য দিয়ে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট। জন সমর্থন যেখানে অকুণ্ঠ দায়বদ্ধতাও সেখানে বেশি। নির্বাচন পরবর্তী নতুন সরকার গঠনের পর থেকেই সেবা প্রত্যাশীরা ফ্যামেলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড সেবার সাথে সংশ্লষ্ট বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে যোগাযোগ শুরু করেছেন। সেই সাথে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের কাছেও ভিড় করছেন কবে নাগাদ এবং কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ এসব সুবিধা পাওয়া যাবে। এতে বুঝা যায় সরকারের প্রতিশ্রুত সকল ওয়াদা ভোটের মাঠে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছিল। তাই ভোটাররাও নির্বাচনী ওয়াদার সকল কিছুরই বাস্তবায়ন দেখতে চায়।
সরকারও মনে হচ্ছে কম যাচ্ছে না। জনগণকে দেওয়া সকল আশ্বাসের ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সরকার গঠনের পর থেকেই ইতোমধ্যে ১৮০ দিনের স্পেশাল কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে জনগুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সেবাকে অগ্রাধিকার দিয়ে। ফ্যামিলি কার্ডের সেবার পাইলটিং শুরু করেছে সারা দেশের আটটি বিভাগের আটটি উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে। আসছে পহেলা বৈশাখে ২২ হাজার কৃষককে কার্ডের মাধ্যমে সুবিধা দেওয়ার মধ্য দিয়ে কৃষক কার্ডের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী। খাল খনন কর্মসূচিও ৫৪ জেলায় আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে গত ১৬ মার্চ। এসব সেবা ও কর্মসূচির পাইলটিং সফল করে পর্যায়ক্রমে সারা দেশে তা সম্প্রসারণ করা হবে। আলোচিত অন্যান্য সেবার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী দফায় দফায় মিটিং করছেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর সাথে, যা সকলকে আশস্ত করেছে।
কিন্তু ইতিবাচক এসব সংবাদের মধ্যেও সরকারের জনগুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলোকে পুঁজি করে কিছু দালাল তৈরি হওয়ার চেষ্ঠা করছে বা বিগত বছরগুলোর পুরাতন দলালরা আবারও চাঙা হওয়ার চেষ্টা করছে। সেই সাথে সামাজিক মাধ্যমে এক শ্রেণিকে দেখা গেছে, চিরাচরিত কায়দায় সকল বিষয়কে গুজব আকারে ছড়িয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে মাঠপর্যায়ে কার্ডের মাধ্যমে সেবা শুরু হওয়ার অনেক আগেই উপজেলা, জেলা পর্যায়ের সরকারি অফিসার থেকে শুরু করে সরকারের দায়িত্বশীলদের বারবার সতর্ক করতে শোনা যাচ্ছে। এতে বুঝাই যাচ্ছে সরকার ঘোষিত এসব সরকারি সুবিধা পুরোপুরি বাস্তবায়নের সময় এসব দালাল ও গুজব তৈরির কারিগররা আরও ঝেকে বসার চেষ্টা করবে যে কোনো ভালো কাজকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য।
শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাই পারে সকল সমস্যার বিপরীতে সঠিক তথ্যের পাশাপাশি যথাযথ ব্যক্তির নিকট সরকারের সুবিধাগুলো পৌঁছে দিতে। বাংলাদেশে বর্তমানে বিদ্যমান গ্রামীণ স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা তিন ধাপের মধ্যে রয়েছে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদ। যার মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদের সাথে জনগণের যোগাযোগ সরাসরি। ইউনিয়ন পরিষদগুলো ৯টি ওয়ার্ডে ১২ জন সদস্যের মাধ্যমে জনগণের সাথে সম্পৃক্ত। কিন্তু বাস্তবতা হলো ইউনিয়নের নির্বাচন পরবর্তী এসব জনপ্রতিনিধিদের আর জনগণের ঘরে ঘরে বা মহল্লায় মহল্লায় গিয়ে খোঁজ নিতে দেখা যায় না। আর খোঁজ নেয়ারও সুযোগ নেই। কারণ পরিষদ বা সরকার থেকে দেওয়া সম্মানি অনেক কম থাকায় এসব মেম্বারকে তাদের নিজস্ব পেশার মাধ্যমেই জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। তাছাড়া ভোটের রাজনীতিতে সবারই নিজস্ব কিছু বলয় থাকে, তাই সরকারি যে কোনো সেবা আসার সাথে সাথে জনপ্রতিনিধিরা তাদের মুখস্থ করা লোকের বাইরে সেবা দিতে চান না। এতে করে প্রকৃত লোক কাঙিক্ষত সুবিধা পান না। ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে মাঝেমধ্যে বিভিন্ন সেবা ও উন্নয়ন কাজের অগ্রাধিকার নিয়ে জনসম্মুখে কিছু সভা করার কথা থাকলেও সেগুলো হয় দায়সারাভাবে। কিন্তু গ্রাম বা ওয়ার্ড পর্যায়ে এ ধরনের জবাবদিহিতামূলক সভার আয়োজন নেই বললেই চলে। তাছাড়া সময়ের সাথে সাথে পরিষদগুলো থেকে মানুষের সেবার পরিধিও বাড়ছে দিন দিন। দুয়ারে দুয়ারে সঠিক সেবা পৌঁছে দেওয়ার মতো জনবলও পরিষদগুলোতে নেই।
মাঠ পর্যায়ে সরকারি সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে দিতে নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে জনগণ পর্যন্ত শক্তিশালী, তাৎক্ষণিক জবাবদিহি ও স্বচ্ছ সংযোগ অত্যন্ত জরুরি। সেই সংযোগ স্থাপনে বিশস্ত মাধ্যম হতে পারে ‘গ্রাম সরকার’। উন্নয়ন পরিকল্পনায় স্থানীয় নেতৃত্ব কাজে লাগানো, স্বাস্থ্যসেবায় ও উৎপাদনে সহযোগিতা, যেকোনো কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি, বৈদেশিক বা সরকারের অনুদানের ওপর নির্ভরতা কমানো, দল বা সমবায়ভিত্তিক উন্নয়নকে ধারণ করে আগেও গ্রামসরকার বা স্বনির্ভর গ্রামসরকার বেশ প্রশংসা অর্জন করেছিল। গ্রাম সরকার সবচেয়ে প্রশংসা লাভ করেছে ১৯৭৬ সালের পর পরবর্তী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসন আমলে। সফলতার প্রমাণের অংশ হিসেবে ১৯৮০ সাথে প্রায় ৮৬ হাজার গ্রাম সরকার গঠনের প্রমাণাদি পাওয়া যায় বিভিন্ন মাধ্যম থেকে। তখন তিনি তার দলকে স্বনির্ভর গ্রাম সরকারের মাধ্যমে গ্রামের যে কোনো উন্নয়ন ও সমস্যায় কাজে লাগাতে পেরেছিলেন। প্রেসিডেন্ট জিয়া অত্যন্ত দক্ষতার সাথে গ্রাম সরকারের কর্মী বাহিনীকে সরকারের উন্নয়নে কাজে লাগাতে পারায় তখন যে কোনো কাজ হয়েছে দ্রুততা ও স্বচ্ছতার সাথে। পবরর্তীতে ২০০৩ সালে ‘স্বনির্ভর গ্রাম সরকার’ নাম পরিবর্তন করে ‘গ্রাম সরকার’ নামে আইনটি পাস হয়। ২০০৮ সালের জুনে আইনটি বিলুপ্ত করা হয়। ১৯৮০ সালের দিকে করা স্বনির্ভর গ্রাম সরকারের সাংগঠনিক কাঠামো থেকে ২০০৩ সালে করা গ্রাম সরকারের সাংগঠনিক ব্যবস্থায় কিছুটা পবিবর্তন আনা হয়। ২০০৩ সালে পাস হওয়া আইনে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্যকে সভাপতি ও মহিলা সদস্যকে উপদেষ্টা করে ১৫ সদস্যের কমিটি করা হয়। কমিটিতে বিভিন্ন শ্রেণি, পেশা, লিঙ্গ, ধর্মের মানুষদের সমন্বয় হয়। কমিটিতে এ ধরনের সমন্বয়টা বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছিল।
সরকার জনগণকে দেওয়া নির্বাচনি ইশতিহার বাস্তবায়নে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সকারের চাওয়াকে সহযোগিতার লক্ষ্যে প্রায় প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ তাদের নিজস্ব উদ্যোগে আলাদাভাবে ১৮০ দিনের বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। সরকার গঠনের পরপরই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জনগণকে দেওয়া বিভিন্ন ওয়াদার বিষয়ে বেশ সচেষ্ট দেখা গেছে। সরকার গঠনের মাত্র ৩০ দিন না যেতেই ঢাকার কড়াইল বস্তিসহ আটটি পাইলটিং জায়গায় ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে দেওয়া সুবিধা শুরু করে দিয়েছেন। এত অল্প সময়ের মধ্যে কাজটা শুরু করা দুরূহ হলেও সকলের সহযোগিতায় তা তিনি করে দেখিয়েছেন। ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফ, ফ্যামেলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খনন, স্বাস্থ্য কাডের্র মতো শতশত সেবা যখন দেশব্যাপী পুরোদমে বাস্তবায়ন শুরু হবে তখন দালাল, গুজববাজ, দুর্নীতিবাজদের বিপরীতে গিয়ে সঠিক ব্যক্তিকে যথাযথ সেবা দেওয়ার মতো সকারের প্রস্তুতি কতটুকু তা এখনি ভেবে দেখা দরকার। শুধু ব্যক্তি কেন্দ্রিক সেবা নয় সেই সাথে উন্নয়ন কাজও সুষমভাবে ও সঠিকভাবে হচ্ছে কি না তার জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য একটা দায়িত্বশীল নাগরিক সমাজ প্রস্তুত করা সরকারের উচিত বলে মনে হয়। এ ক্ষেত্রে আশির দশকের স্বনির্ভর গ্রাম সরকারের মতো একটা নাগরিক সমাজ গঠন করলে তাদের সহযোতিায় সরকার যে কোনো কাজ দক্ষতা ও দ্রুততার সাথে বাস্তবায়ন করতে পারবে বলে আশা করা যায়। ১৯৮০ সালের সমাজব্যবস্থা ও কাজের ধরনের সাথে বর্তমানের সমাজব্যবস্থা ও কাজের ধরনের বেশ পার্থক্য রয়েছে। তাই ‘গ্রাম সরকার’ পুনর্গঠনে বর্তমান সরকার হাত দিলে পরিবর্তিত বিষয়গুলোকে অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে। গ্রাম সরকারের সদস্য নির্বাচনের সময় সমাজের মধ্যে নিবেদিত, গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিককর্মী, সমাজসেবায় আগ্রহী লোকদেরই শুধু সুযোগ করে দিতে হবে। যারা কেবল সমাজের কল্যাণের স্বার্থে সত্যিকার অর্থে সমাজে যারা পিছিয়ে পড়েছে তাদের জন্য বিভিন্ন ফোরামে ও বৈঠকে কথা বলার ও পাশে থাকার ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ। অবশ্যই দুষ্টু রাজনৈতিক কর্মী, লোভী, সমাজের জন্য ক্ষতিকারকদের এখানে সুযোগ দেওয়া যাবে না।
স্থানীয় সরকারের সবচেয়ে নিম্নস্তর বা ইউনিয়ন পরিষদের সহযোগী হিসেবে ধরে সারা দেশে গ্রাম সরকার গঠনে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের কোনো একটি বিভাগকে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে, যাকে উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ সহযোগিতা করবে। স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মধ্যে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (বিআরডিবি) এবং সমবায় অধিদপ্তর দুটি বিভাগেরই সমিতি ও দল গঠনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাদের যে কোনো একটি বিভাগকে গ্রাম সরকার গঠনে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। যেহেতেু গ্রাম সরকার একটি অলাভজনক ব্যবস্থাপনা, তাই এটাকে নিবন্ধনের মতো জটিল ও সময়সাপেক্ষ পদ্ধতিতে না জড়ানোই ভালো। সেই হিসেবে বিআরডিবিকেই দায়িত্ব দেওয়া সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হবে। তাছাড়া বিআরডিবির বিভিন্ন সময়ে ধরে প্রায় দুই লাখ কৃষক উন্নয়ন সমিতি, মহিলা উন্নয়ন সমিতি, যুব উন্নয়ন সমিতি, অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে উন্নয়ন, সবশেষ একটি বাড়ি একটি খামারের মতো সফল দল ও সমিতি নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে।
সরকারের শপথ গ্রহণের একমাস পার না হতেই বহুল আলোচিত ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সুবিধা পেয়ে পাইলটিং এলাকার নারীরা বেশ উৎফুল্ল। তাদের এই বাঁধভাঙা উল্লাসে সরকার ও জনগণ সবাই আশায় বুক বাঁধতে শুরু করেছে এই ভেবে যে, সঠিক নারী সদস্যকেই এখানে বাছাই করা হয়েছে। কোনো ধরনের দল বা স্বজনপ্রীতি করা হয়নি। প্রথম সংসদ অধিবেশনের আগেই প্রধানমন্ত্রী খাল খনন ও ভবিষ্যতে যাকাত আদায় ও বিতরণ ব্যবস্থার বিষয়ে দেশবাসীর মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছেন। ৪৫ বছর আগের সফল খাল খননের সাথে বর্তমানের খাল খনন ব্যবস্থার বিশাল পার্থক্য থাকবে, বিশেষ করে খননের পর যে মাটি বের হবে এখন সেই মাটির দাম অনেক বেশি। সরকার ইচ্ছা করলেই এই সকল বিষয়েই একটি নিবেদিত গ্রাম সরকারকে কাজে লাগাতে পারবে।
সুফলভোগীদের জন্য সরকারের শতশত সেবা সারা দেশে এক সাথে শুরু হলে জনগণের আস্থা ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে দালাল, গুজববাজ, দুর্নীতিবাজদের এসব ভালোকাজ থেকে দূরে রাখতে হবে। ওদের দমিয়ে রেখে সঠিক ব্যক্তিকে কাঙিক্ষত সেবা ও সঠিক জায়গায় যথাযথ উন্নয়ন করতে পারলেই সাধারণ জনগণ খুশি। তার জন্য সৎ, দক্ষ, নিবেদিত ও সমাজসেবায় আগ্রহী ব্যক্তিদের নিয়ে একটি পরিকল্পিত গ্রাম সরকার ব্যবস্থা সরকারের অন্যতম সহযোগী হিসেবে কাজে লাগতে পারে।
লেখক: পল্লী উন্নয়ন কর্মী ও সাবেক সভাপতি জবি সাংবাদিক সমিতি

