কেন ডাচরা ভাসমান বাড়ির দিকে ঝুঁকছে

কেন ডাচরা ভাসমান বাড়ির দিকে ঝুঁকছে
নেদারল্যান্ডসের ভাসমান ঘরগুলো একটি স্তম্ভের সাথে সংযুক্ত, এবং পানির স্তর অনুসারে স্তম্ভটি উপরে এবং নিচে নামতে পারে। ছবি: গেটি ইমেজ

ক্রমবর্ধমান বন্যা এবং আবাসন সংকটের সম্মুখীন হয়ে নেদারল্যান্ডসে ভাসমান বাড়ির প্রতি মানুষের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। এই ভাসমান জনবসতিগুলো এখন ফ্রেঞ্চ পলিনেশিয়া থেকে শুরু করে মালদ্বীপের মতো বন্যাপ্রবণ দেশগুলোতে ডাচদের নেতৃত্বে আরও উচ্চাভিলাষী প্রকল্প গ্রহণে অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে।

২০২২ সালের অক্টোবরে যখন একটি শক্তিশালী ঝড় আঘাত হানে, তখন আমস্টারডামের ‘শুনশিপ’ নামক ভাসমান এলাকার বাসিন্দাদের মনে এটি মোকাবিলায় কোনো সংশয় ছিল না। তারা তাদের সাইকেল এবং বাইরের বেঞ্চগুলো শক্ত করে বেঁধে ফেললেন, প্রতিবেশীরা পর্যাপ্ত খাবার ও পানি মজুত রেখেছে কি না তা নিশ্চিত করলেন এবং নিশ্চিন্তে ঘরের ভেতর অবস্থান নিলেন। তাদের পুরো এলাকাটি স্টিলের মজবুত পিলারের ওপর ভর করে পানির স্তরের সাথে সাথে ওঠানামা করছিল—বৃষ্টিতে পানি বাড়ার সাথে সাথে এটি উপরে উঠছিল এবং পানি নেমে গেলে আবার আগের অবস্থানে ফিরে আসছিল।

দুই বছর আগে শুনশিপ-এ চলে আসা ডাচ টেলিভিশন প্রযোজক সিতি বুলেন বলেন, “আমরা ঝড়ের সময় বেশি নিরাপদ বোধ করি কারণ আমরা ভাসছি। আমার কাছে এটি বেশ অদ্ভুত লাগে যে, সারা বিশ্বে পানির ওপর ঘর তৈরি করাকে কেন এখনো অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে না।”

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং শক্তিশালী ঝড়ের কারণে জলোচ্ছ্বাস বাড়তে থাকায়, এই ভাসমান এলাকাগুলো বন্যা প্রতিরোধের একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এটি উপকূলীয় সম্প্রদায়গুলোকে জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করবে। ভূমির স্বল্পতা কিন্তু ঘনবসতিপূর্ণ দেশ নেদারল্যান্ডসে এই ধরণের বাড়ির চাহিদা বাড়ছে। ফলে কর্তৃপক্ষও এখন অঞ্চল নির্ধারণী আইন (zoning laws) আপডেট করছে যাতে ভাসমান ঘর নির্মাণ আরও সহজ হয়।

গ্রিনলেফট পার্টির আমস্টারডাম সিটি কাউন্সিলর নিনকে ফ্যান রেনসেন বলেন, “পৌরসভা ভাসমান ঘর তৈরির এই ধারণাকে আরও বিস্তৃত করতে চায়, কারণ এটি আবাসনের জন্য জায়গার একটি বহুমুখী ব্যবহার এবং এটি একটি টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করে।”
নেদারল্যান্ডসের এই ভাসমান জনবসতিগুলো গত দশকে একটি সফল মডেল হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে, যার ওপর ভিত্তি করে ডাচ প্রকৌশলীরা এখন বড় বড় প্রকল্প হাতে নিচ্ছেন। এগুলো কেবল ব্রিটেন, ফ্রান্স বা নরওয়ের মতো ইউরোপীয় দেশেই নয়, বরং ফ্রেঞ্চ পলিনেশিয়া এবং মালদ্বীপেও ছড়িয়ে পড়ছে, যেখানে ভারত মহাসাগরের উচ্চতা বৃদ্ধি এখন অস্তিত্বের সংকট তৈরি করেছে। এমনকি বাল্টিক সাগরে ভাসমান দ্বীপ তৈরি করে ছোট শহর গড়ার প্রস্তাবও এসেছে।

একটি ভাসমান বাড়ি যেকোনো উপকূলে নির্মাণ করা সম্ভব। এটি সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি বা বৃষ্টির পানির বন্যায় কোনো ক্ষতি ছাড়াই পানির ওপর ভেসে থাকতে পারে। হাউসবোটের মতো এগুলো যখন-তখন সরিয়ে ফেলা যায় না; এগুলো সাধারণত স্টিলের পিলারের মাধ্যমে তীরের সাথে স্থায়ীভাবে আটকানো থাকে এবং স্থানীয় বিদ্যুৎ ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার সাথে যুক্ত থাকে। কাঠামোগতভাবে এগুলো স্থলের বাড়ির মতোই, তবে এতে বেসমেন্টের বদলে একটি কংক্রিটের কাঠামো (hull) থাকে যা পানির ওপর ভারসাম্য রক্ষা করে। নেদারল্যান্ডসে এগুলো সাধারণত প্রাক-নির্মিত (prefabricated) হয়ে থাকে এবং কাঠ, স্টিল ও কাঁচ দিয়ে তৈরি তিনতলা বিশিষ্ট বর্গাকার ঘর হয়।

২০০৩ সালে ‘ওয়াটারস্টুডিও’ (Waterstudio) প্রতিষ্ঠা করা স্থপতি কোয়েন ওলথুইস মনে করেন, এই ঘরগুলোর প্রযুক্তিগত সরলতাই এদের সবচেয়ে বড় সুবিধা। তার নকশা করা ঘরগুলো মাটির প্রায় ৬৫ মিটার গভীরে পোঁতা পিলারের ওপর স্থির থাকে এবং ঢেউয়ের ধাক্কা সামলাতে এতে বিশেষ শক-অ্যাবজরবেন্ট উপকরণ ব্যবহার করা হয়। তিনি বলেন, লিফট যেমন শহরগুলোকে আকাশচুম্বী করতে সাহায্য করেছিল, ভাসমান প্রযুক্তিও শহরগুলোকে একইভাবে বদলে দেবে।

নেদারল্যান্ডসের এক-তৃতীয়াংশ ভূমি সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে। আমস্টারডামে প্রায় ৩,০০০ ঐতিহ্যবাহী হাউসবোট আছে। শুনশিপ প্রকল্পটি ৩০টি বাড়ির সমন্বয়ে গঠিত, যেখানে বাসিন্দারা বাইক, গাড়ি এবং খাবার ভাগ করে নেন। প্রতিটি বাড়ি নিজস্ব ‘হিট পাম্প’ ব্যবহার করে এবং ছাদের এক-তৃতীয়াংশ জুড়ে থাকে সৌর প্যানেল ও গাছপালা। বাসিন্দারা নিজেদের ব্যবহারের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে বিক্রিও করেন।

রটারডাম শহরটি ৯০% সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে অবস্থিত। এখানে বিশ্বের বৃহত্তম ভাসমান অফিস বিল্ডিং এবং একটি ভাসমান খামারও রয়েছে যেখানে রোবটের মাধ্যমে গরুর দুধ দোহন করা হয়। শহরটি এখন ভাসমান স্থাপত্যকে তাদের জলবায়ু অভিযোজন কৌশলের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে গ্রহণ করেছে।

রটারডাম সিটির চিফ রেজিলিয়েন্স অফিসার আর্নড মোলেনার বলেন, “আমরা পানিকে এখন আর শত্রু হিসেবে দেখি না, বরং সুযোগ হিসেবে দেখি।”

ডাচরা এখন তাদের আবাসন সংকট মেটাতে আগামী ১০ বছরে ১০ লাখ নতুন ঘর তৈরির লক্ষ্য নিয়েছে। যেহেতু স্থলের অভাব রয়েছে, তাই ভাসমান বাড়িগুলো এই চাপ কমাতে বড় ভূমিকা রাখবে। ব্লু-২১ (Blue21) নামক একটি ডাচ কোম্পানি বাল্টিক সাগরে ৫০,০০০ মানুষের জন্য ভাসমান দ্বীপ তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে। অন্যদিকে, মালদ্বীপের রাজধানী মালের কাছে ২০,০০০ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী ভাসমান ঘর নির্মাণের কাজ এই শীতেই শুরু করবে ওয়াটারস্টুডিও।

ওলথুইস বলেন, “ভাসমান বাড়ি তৈরির ধারণাকে এখন আর পাগলামি ভাবা হয় না। এখন আমরা পানিকে ব্যবহার করে ‘ব্লু সিটি’ বা নীল শহর তৈরি করছি।”

তবে কিছু চ্যালেঞ্জও আছে। প্রবল বাতাস বা বড় জাহাজ যাতায়াতের সময় এই বাড়িগুলো কিছুটা দুলতে পারে। সিতি বুলেন জানান, শুরুতে ঝড়ের সময় তিনতলার রান্নাঘরে গেলে তার পেটের ভেতর অস্বস্তি হতো (Motion sickness), তবে এখন তিনি এতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। এছাড়া ভাসমান বাড়ির জন্য বিশেষ ওয়াটারপ্রুফ তার এবং পাম্পের প্রয়োজন হয় যা মূল শহরের গ্রিডের সাথে যুক্ত থাকে।
ব্লু-২১ এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা রুজার ডি গ্রাফ বলেন, গত বছর জার্মানি এবং বেলজিয়ামে যে ভয়াবহ বন্যায় ২২২ জন মারা গেছেন, সেখানে যদি ভাসমান জনবসতি থাকত, তবে হয়তো অনেক প্রাণ এবং কোটি কোটি ডলারের সম্পদ রক্ষা পেত।

তিনি সতর্ক করে বলেন, “এই শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে কোটি কোটি মানুষ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাস্তুচ্যুত হবে। তাই এখনই আমাদের ভাসমান আবাসন ব্যবস্থার পরিধি বাড়ানো শুরু করতে হবে।”

সূত্র:বিবিসি