বিশ্বে ৬০ বছর আগেও জাতিগত বৈষম্য থামানোর চেষ্টা, যেভাবে ব্যর্থ হয়

বিশ্বে ৬০ বছর আগেও জাতিগত বৈষম্য থামানোর চেষ্টা, যেভাবে ব্যর্থ হয়
১৯৬৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন। ছবি: এপির

মেলিসা হেন্ড্রিকস ও রিম খাদরাউই  

সাধারণত গল্পটি এমনভাবে বলা হয় যে, পশ্চিমা দেশগুলোই বিশ্বকে মানবাধিকার ‘উপহার’ দিয়েছে এবং তারাই এর একমাত্র অভিভাবক। তবে অনেকের জন্য এটি আশ্চর্যজনক হতে পারে যে, জাতিগত বৈষম্য নিষিদ্ধ করার আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোটি মূলত গড়ে উঠেছে ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা দক্ষিণ গোলার্ধের উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রচেষ্টায়।

১৯৬৩ সালে, উপনিবেশমুক্ত হওয়ার ঢেউয়ের মধ্যে, নয়টি সদ্য স্বাধীন আফ্রিকান রাষ্ট্র জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে একটি প্রস্তাব পেশ করে। তাদের দাবি ছিল—জাতিগত বৈষম্য দূরীকরণে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি প্রণয়ন করা। সেনেগালের প্রতিনিধি তখন পর্যবেক্ষণ করেছিলেন: ‌‌‘আফ্রিকার ঔপনিবেশিক অঞ্চলগুলোতে এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় জাতিগত বৈষম্য তখনও একটি সাধারণ নিয়ম ছিল এবং বিশ্বের অন্যান্য অংশেও এটি অজানা ছিল না… এই লড়াইয়ে সব রাষ্ট্রকে শামিল করার সময় এসেছে।’

এর দুই বছর পর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয় যুগান্তকারী ‘ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন অন দ্য এলিমিনেশন অব অল ফর্মস অব রেশিয়াল ডিসক্রিমিনেশন’ (আইসিইআরডি)। এই কনভেনশন বর্ণগত পার্থক্যের ভিত্তিতে যেকোনো ধরনের শ্রেষ্ঠত্বের মতবাদকে ‘বৈজ্ঞানিকভাবে মিথ্যা, নৈতিকভাবে নিন্দনীয় এবং সামাজিকভাবে অন্যায্য’ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে।

গত ২১ ডিসেম্বর এই চুক্তি গ্রহণের ৬০ বছর পূর্ণ হয়েছে। অথচ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ আজও জাতিগত বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন—তা পুলিশি কার্যক্রম হোক, অভিবাসন নীতি হোক বা শ্রম শোষণের ক্ষেত্রই হোক।

ব্রাজিলে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল নথিবদ্ধ করেছে, চলতি বছরের অক্টোবরে রিও ডি জেনিরোর বস্তিগুলোতে (ফাবেলা) এক ভয়াবহ পুলিশি অভিযানে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে ১০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই দারিদ্র্যপীড়িত আফ্রো-ব্রাজিলীয়।

তিউনিসিয়ায় আমরা দেখেছি, গত তিন বছর ধরে কর্তৃপক্ষ অভিবাসন নীতি ব্যবহার করে কৃষ্ণাঙ্গ শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীদের জাতিগতভাবে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে গ্রেপ্তার, আটক এবং গণ-বহিষ্কার করছে।

এদিকে সৌদি আরবে কেনিয়ার নারী গৃহকর্মীরা তাদের নিয়োগকর্তাদের দ্বারা বর্ণবাদ ও শোষণের শিকার হচ্ছেন এবং অমানবিক কর্মপরিবেশের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্রে পদ্ধতিগত বর্ণবাদ মোকাবিলায় নেওয়া ‘বৈচিত্র্য, ইক্যুইটি ও অন্তর্ভুক্তি’ উদ্যোগগুলো বিভিন্ন ফেডারেল সংস্থা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। অভিবাসী ও শরণার্থীদের লক্ষ্য করে ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট’ (আইসিই)-এর অভিযানগুলো প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গণ-বহিষ্কার এবং আটকের এজেন্ডার এক ভয়াবহ চিত্র, যার মূলে রয়েছে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী বয়ান। আটক কেন্দ্রগুলোতে রাখা অভিবাসীদের ওপর নির্যাতন এবং সুপরিকল্পিত অবহেলার নজির রয়েছে, যা তাদের মানুষ হিসেবে হেয় করা এবং শাস্তি দেওয়ার জন্যই তৈরি করা হয়েছে।

অন্যদিকে, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল নথিবদ্ধ করেছে, কীভাবে নতুন ডিজিটাল প্রযুক্তি বর্ণবাদকে স্বয়ংক্রিয় ও সুসংহত করছে। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো বর্ণবাদী ও বিদেশি-বিদ্বেষী কন্টেন্ট প্রচারের অনিয়ন্ত্রিত ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাজ্যের সাউথপোর্টে সাম্প্রতিক বর্ণবাদী দাঙ্গা নিয়ে আমাদের তদন্তে দেখা গেছে যে, ‘এক্স’ (টুইটার)-এর ডিজাইন ও নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো উসকানিমূলক বর্ণবাদী বয়ান ছড়ানোর উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করেছিল, যার ফলে মুসলিম ও অভিবাসীরা সহিংসতার শিকার হয়েছেন।

এমনকি গ্লোবাল সাউথের মানবাধিকার কর্মীরাও যখন মানবাধিকার বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে অংশ নিতে পশ্চিমা দেশগুলোতে ভিসার আবেদন করেন, তখন তাদেরও জাতিগত বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হয়।

পদ্ধতিগত বর্ণবাদের এই প্রতিটি ঘটনার শিকড় প্রোথিত আছে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক আধিপত্য এবং সেই সময়কার বর্ণবাদী মতাদর্শের মধ্যে। প্রায় চার শতাব্দী ধরে ছয়টি মহাদেশ জুড়ে বিস্তৃত সেই যুগে আদিবাসীদের নিশ্চিহ্ন করা থেকে শুরু করে আটলান্টিক দাস ব্যবসার মতো নৃশংসতা ঘটেছে, যার ঐতিহাসিক পরিণতি আজও আমরা বয়ে বেড়াচ্ছি।

বিশ্বজুড়ে অধিকার-বিরোধী আন্দোলনের উত্থান বর্ণবাদী ও বিদেশি-বিদ্বেষী বক্তব্যকে পুনরায় জাগিয়ে তুলেছে। অভিবাসী ও শরণার্থীদের বলির পাঁঠা বানানো হচ্ছে এবং বৈষম্যবিরোধী সুরক্ষা ব্যবস্থাগুলো সংকুচিত করা হচ্ছে।

একই সময়ে, পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলের চালানো গণহত্যাকে বৈধতা দিতে এবং ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষকে বিচার ও জবাবদিহি থেকে রক্ষা করতে আন্তর্জাতিক আইন ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করতেও দ্বিধা করছে না।

ঠিক যেভাবে ৬০ বছর আগে আফ্রিকান দেশগুলো আইসিইআরডি তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিল, তেমনি আজও গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো জাতিগত নিপীড়ন, অন্যায় ও অসমতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। দক্ষিণ আফ্রিকা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মামলা করেছে এবং ‘দ্য হেগ গ্রুপ’ গঠন করেছে—যা ইসরায়েলকে গণহত্যার জন্য দায়ী করতে আটটি দেশের একটি জোট।

ক্ষতিপূরণ বা ‘রেপারেশন’ পাওয়ার লড়াইয়েও ক্যারিবীয় ও আফ্রিকান রাষ্ট্রগুলো এবং আদিবাসী ও আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষরাই নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ক্যারিবীয় কমিউনিটি (ক্যারিকম) ইউরোপীয় সরকারগুলোকে তাদের ঔপনিবেশিক অতীতের দায় স্বীকার করতে চাপ দিচ্ছে।

গত মাসে আফ্রিকান ইউনিয়ন ২০২৬-৩৬ সময়কালকে ‘ক্ষতিপূরণের দশক’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। আলজিয়ার্সে ‘ঔপনিবেশিক অপরাধ’ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে আফ্রিকান নেতারা সমবেত হয়ে আন্তর্জাতিক আইনে উপনিবেশবাদকে ‘অপরাধ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার দাবি জানিয়েছেন।

কিন্তু কেবল এটুকুই যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্রগুলোকে বর্ণবাদকে একটি কাঠামোগত ও পদ্ধতিগত সমস্যা হিসেবে মোকাবিলা করতে হবে। দাসপ্রথা এবং উপনিবেশবাদ যে বর্তমান সময়ের ওপর কোনো প্রভাব না ফেলা অতীত—এমন ভান করা বন্ধ করতে হবে।
সারা বিশ্বে মানুষ এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। গত মাসে ব্রাজিলে লাখ লাখ আফ্রো-ব্রাজিলীয় নারী বর্ণবাদী ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার বিরুদ্ধে ‘রেপারেশন অ্যান্ড ওয়েলবিয়িং’ পদযাত্রা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রেও হাজার হাজার মানুষ এ বছর ফেডারেল অভিবাসন অভিযানের বিরুদ্ধে লস অ্যাঞ্জেলেসের রাস্তায় নেমেছেন এবং শিকাগোর বাসিন্দারা অভিবাসী সম্প্রদায়কে রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন।

সরকারগুলোকে তাদের জনগণের কথা শুনতে হবে এবং আইসিইআরডি ও জাতীয় আইনের অধীনে প্রান্তিক ও নিপীড়িত মানুষকে বৈষম্য থেকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি পালন করতে হবে।

লেখক: মেলিসা হেন্ড্রিকস ও রিম খাদরাউই (অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের জাতিগত ন্যায়বিচার বিষয়ক উপদেষ্টা)

দ্রষ্টব্য: আল-জাজিরার সম্পাদকীয় থেকে অনুদিত। এই নিবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকদের নিজস্ব।