মো. শফিউল নাঈম
একটি জাতির মেরুদণ্ড হলো তার শিক্ষা। কিন্তু আজ আমাদের দেশের সেই মেরুদণ্ড কতটা শক্ত ভিত্তি বা সঠিক দিশার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তা নিয়ে জনমনে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। গত কয়েক দশকে দেশে সাক্ষরতার হার বেড়েছে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে এবং জিপিএ-৫-এর জোয়ার বয়ে গেছে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, শিক্ষার ‘সংখ্যাগত’ মান বাড়লেও ‘গুণগত’ মান নিয়ে আমরা গভীর সংকটে নিমজ্জিত।
বিদ্যমান সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা
বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান সমস্যা হলো জীবনমুখী ও কর্মমুখী শিক্ষার অভাব। আমাদের পাঠ্যক্রম এখনো অনেকাংশেই তত্ত্বীয় ও মুখস্থনির্ভর। ফলে উচ্চশিক্ষা শেষ করেও শিক্ষার্থীরা কর্মসংস্থানের বাজারে নিজেদের যোগ্য হিসেবে প্রমাণ করতে হিমশিম খাচ্ছে। শিক্ষিত বেকারের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা তারই প্রমাণ। এছাড়া, ঘনঘন কারিকুলাম পরিবর্তন এবং সঠিক গবেষণার অভাব শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়কেই এক ধরনের গোলকধাঁধায় ফেলে দিয়েছে। বাণিজ্যিকীকরণের কবলে পড়ে শিক্ষা আজ পণ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে কোচিং সেন্টারগুলো সমান্তরাল শিক্ষাব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।
রাজনীতির নেতিবাচক প্রভাব
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেজুড়বৃত্তি রাজনীতির প্রভাব শিক্ষার পরিবেশকে বিষিয়ে তুলছে। শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে প্রশাসনিক পদায়ন—সবখানেই মেধার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছাত্র রাজনীতি এখন আর জনসেবা বা মেধা বিকাশের ক্ষেত্র নয়, বরং ক্ষমতা প্রদর্শনের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। দলীয় রাজনীতির কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রায়ই অস্থিরতা তৈরি হয়, যা সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত করে। শিক্ষকদের একটি বড় অংশ এখন শিক্ষকতার চেয়ে দলীয় আনুগত্য প্রকাশে বেশি ব্যস্ত, যা শিক্ষক সমাজের নৈতিক মর্যাদাকে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করছে।
শিক্ষক ও অভিভাবকদের ভূমিকা ও দায়বদ্ধতা
শিক্ষকরা হলেন মানুষ গড়ার কারিগর। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে একদল শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের চেয়ে প্রাইভেট টিউশনি ও কোচিং বাণিজ্যে বেশি আগ্রহী। একজন আদর্শ শিক্ষক কেবল পাঠ্যবই পড়ান না, তিনি শিক্ষার্থীদের নীতি-নৈতিকতা ও জীবনবোধ শেখান। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকদের সেই নৈতিক অবস্থান ফিরিয়ে আনা জরুরি।
অন্যদিকে, অভিভাবকদের ‘জিপিএ-৫’ পাওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা কোমলমতি শিশুদের শৈশব কেড়ে নিচ্ছে। সন্তান ভালো মানুষ হওয়ার চেয়ে ‘প্রতিযোগিতায় জেতা’ বড় হয়ে উঠছে অভিভাবকদের কাছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। সন্তানকে ভালো গ্রেড পাওয়ার যন্ত্র না বানিয়ে তাকে অনুসন্ধিৎসু এবং সৃজনশীল করে গড়ে তোলাই হওয়া উচিত অভিভাবকের প্রধান লক্ষ্য।
উত্তরণের পথ: কী করা উচিত?
শিক্ষাব্যবস্থাকে সংকটমুক্ত করতে হলে প্রথমেই শিক্ষাকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। মেধার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ এবং যোগ্যতার নিরিখে পদোন্নতি নিশ্চিত করতে হবে।
১. কর্মমুখী শিক্ষা: পাঠ্যক্রমকে বিশ্ববাজারের সাথে সংগতিপূর্ণ এবং কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন করতে হবে। যেন একজন শিক্ষার্থী ডিগ্রি শেষ করে বেকার না থাকে।
২. বাজেট বৃদ্ধি: শিক্ষা খাতে জাতীয় বাজেটের বরাদ্দ বাড়ানো এবং গবেষণায় বিনিয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
৩. কোচিং প্রথা বিলোপ: শ্রেণিকক্ষেই যেন ছাত্রছাত্রীরা প্রয়োজনীয় শিক্ষা পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে এবং শিক্ষকদের পর্যাপ্ত বেতন ও সামাজিক নিরাপত্তা প্রদান করতে হবে।
৪. মূল্যায়ন পদ্ধতি পরিবর্তন: মুখস্থনির্ভর পরীক্ষার পরিবর্তে সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা এবং নৈতিক গুণাবলি মূল্যায়নের ব্যবস্থা করতে হবে।
৫. রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ক্যাম্পাস: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সকল ধরনের লেজুড়বৃত্তি রাজনীতি থেকে মুক্ত রেখে মেধা চর্চার চারণভূমি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
শিক্ষা কোনো শৌখিন বস্তু নয়, এটি একটি জাতির টিকে থাকার রসদ। শুধু কারিকুলাম পরিবর্তন বা ডিজিটাল অবকাঠামো দিয়ে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়, যদি না শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবক ও রাষ্ট্র এই প্রক্রিয়ায় দায়বদ্ধ থেকে কাজ করে। আমরা যদি আধুনিক, বিজ্ঞানমনস্ক ও নৈতিকতাসম্পন্ন একটি প্রজন্ম গড়ে তুলতে ব্যর্থ হই, তবে আগামীর বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা আমাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়বে। রাষ্ট্র ও সমাজকে এখনই সক্রিয় হতে হবে—শিক্ষাকে বাঁচাতে এবং জাতিকে পথ দেখাতে।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক

