রাশিয়ার সহায়তায় ৩ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ কি ইরানের আকাশ সক্ষমতার নতুন ধাপ?

রাশিয়ার সহায়তায় ৩ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ কি ইরানের আকাশ সক্ষমতার নতুন ধাপ?
রাশিয়ার সহায়তায় ৩ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ

জিসান আল যুবাইর 

রাশিয়ার সয়ুজ রকেটে চড়ে একসঙ্গে তিনটি দেশীয়ভাবে নির্মিত ইরানি স্যাটেলাইট কক্ষপথে গেছে। রাশিয়ার সহায়তায় স্যাটেলাইটগুলো আকাশে পাঠানোর মাধ্যমে ইরান নিঃসন্দেহে তার মহাকাশ কর্মসূচিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। ইরানী সংবাদ মাধ্যম মেহের নিউজ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা ৪৮ মিনিটে রাশিয়ার ভস্তোচনি কসমোড্রোম থেকে এই উৎক্ষেপণ সম্পন্ন হয়। মাল্টি-পেলোড মিশনের অংশ হিসেবে জাফর–২, পায়া ও কাওসার স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ইরান মহাকাশ খাতে ধারাবাহিক অগ্রগতি বজায় রাখতে সক্ষম হচ্ছে।

ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে দেখলে মনে হয়- এই উৎক্ষেপণটি রাজনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। এটি নিয়ে সপ্তমবারের মতো ইরান রাশিয়ার উৎক্ষেপণযান ব্যবহার করল, যা দুই দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত সহযোগিতার প্রতিফলন। মস্কোতে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত কাজেম জালালি এই মিশনকে ইরানের মহাকাশ কর্মসূচির জন্য বড় সাফল্য হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন; তিনি বলেছেন— স্যাটেলাইটগুলোর নকশা ও নির্মাণ পুরোপুরি ইরানের ভেতরেই সম্পন্ন হয়েছে। সরকারি সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয় এবং জ্ঞানভিত্তিক বেসরকারি কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত অংশগ্রহণ ইঙ্গিত দেয় যে, ইরান ধীরে ধীরে একটি সমন্বিত ও স্বনির্ভর মহাকাশ অবকাঠামো গড়ে তুলছে।

প্রযুক্তিগত দিক থেকেও এই স্যাটেলাইটগুলো ইরানের সক্ষমতা বৃদ্ধির বার্তা বহন করে। জাফর–২ প্রাকৃতিক সম্পদ পর্যবেক্ষণ, পরিবেশগত পরিবর্তন মূল্যায়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং মানচিত্র তৈরির মতো বেসামরিক কাজে ব্যবহৃত হবে। কাওসার স্যাটেলাইটের উন্নত সংস্করণে যুক্ত হয়েছে ইন্টারনেট অব থিংস বা আইওটি সক্ষমতা, যা স্মার্ট পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থায় তাৎক্ষণিক তথ্য আদান–প্রদানে সহায়তা করবে। অন্যদিকে পায়া বা তোলু–৩ স্যাটেলাইটটি প্রায় ১৫০ কিলোগ্রাম ওজনের হওয়ায় এখন পর্যন্ত ইরানের সবচেয়ে ভারি পৃথিবী পর্যবেক্ষণ স্যাটেলাইট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এসব উন্নয়ন দেখাচ্ছে যে, ইরান কেবল সংখ্যার দিক থেকেই নয়, প্রযুক্তিগত জটিলতার ক্ষেত্রেও ধাপে ধাপে এগোচ্ছে।

এই অগ্রগতির পেছনে ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে তা বুঝতে হলে দেখতে হবে পশ্চিমা দেশগুলোর দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান তার বেসামরিক মহাকাশ কর্মসূচি সম্প্রসারণ কীভাবে অব্যাহত রেখেছে। যদিও পশ্চিমা বিশ্ব প্রায়ই ইরানের মহাকাশ কার্যক্রমকে সন্দেহের চোখে দেখে, তেহরান বারবার এটিকে বেসামরিক ও শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করে আসছে। রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতা ইরানকে একদিকে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলায় একটি বিকল্প কৌশলগত পথও তৈরি করে দিচ্ছে।

সার্বিকভাবে, এই তিন স্যাটেলাইটের উৎক্ষেপণ ইরানের মহাকাশ কর্মসূচিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির প্রযুক্তিগত সক্ষমতার একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও ভারি ও উন্নত স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মাধ্যমে ইরান তার মহাকাশ উপস্থিতি জোরদার করতে পারে, যা আঞ্চলিক রাজনীতি ও বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় নতুন মাত্রা যোগ করবে। ইরানের মহাকাশ সক্ষমতার নতুন অগ্রগতি অর্জনের খবরে পশ্চিমা দেশগুলো কী প্রতিক্রিয়া দেখায় সেটাই এখন দেখার বিষয়।

লেখক: সহ-সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন