মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ যেভাবে রোহিঙ্গা সংকটকে আরও গভীর করছে

তাদের অধিকাংশই পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন প্রতিবেশী বাংলাদেশে। ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ভয়াবহ দমন-পীড়নের পর ইতোমধ্যেই প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী বসতিতে মানবেতর পরিস্থিতিতে দিন কাটাচ্ছেন।
২০১৭ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সীমান্ত অতিক্রম করার পর টেকনাফে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। ছবি: রয়টার্স

মিয়ানমারের চলমান গৃহযুদ্ধের আড়ালে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর সংঘটিত নির্যাতন ও নৃশংসতার চিত্র তুলে ধরেছে আল জাজিরা।

২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ তীব্রতর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ১ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা নিজেদের ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ হয়ে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।

তাদের অধিকাংশই পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন প্রতিবেশী বাংলাদেশে। ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ভয়াবহ দমন-পীড়নের পর ইতোমধ্যেই প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী বসতিতে মানবেতর পরিস্থিতিতে দিন কাটাচ্ছেন।

মিয়ানমারের সামরিক সরকার ও বিদ্রোহী বাহিনীর সংঘাতের মধ্যে পড়ে রোহিঙ্গারা এখন নতুন করে সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কয়েকজন আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, তাদের পরিবারের সদস্যদের জোর করে সশস্ত্র বাহিনীতে নিয়োগ করা হয়েছে। কেউ কেউ হয়েছেন পরিকল্পিত হামলার শিকার; এমনকি কয়েকটি পরিবার গণহত্যার ঘটনাতেও স্বজন হারিয়েছে বলে দাবি করেছে।

এসব ঘটনা ঘটছে রোহিঙ্গাদের ঐতিহাসিক আবাসভূমি রাখাইন রাজ্যে—মিয়ানমারের একটি দুর্গম ও অনেকটাই বিচ্ছিন্ন অঞ্চল, যার বড় অংশ বর্তমানে স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে।

রোহিঙ্গা প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, বর্তমানে আরাকান আর্মির হাতে তারা যে সহিংসতা ও নিপীড়নের মুখোমুখি হচ্ছেন, তা ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর চালানো জাতিগত নিধনের মতোই ভয়াবহ। সেই অভিযানই প্রথমবারের মতো বিশ্বজুড়ে রোহিঙ্গাদের দুর্দশার প্রতি ব্যাপক মনোযোগ তৈরি করেছিল।

তবে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং আরাকান আর্মি—উভয় পক্ষই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং একে অপরকে দায়ী করেছে।

মিয়ানমার উইটনেসের মানবাধিকার অনুসন্ধানকারীদের পাশাপাশি রোহিঙ্গা নাগরিক সাংবাদিকদের সঙ্গে কাজ করে আল জাজিরা অনুসন্ধান করেছে, রাখাইনে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সময় রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আসলে কী ঘটেছে।

এই অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পাচারের সঙ্গে বিদ্রোহী গোষ্ঠীটির সম্ভাব্য যোগসূত্রের অভিযোগ। পাচারের শিকারদের মধ্যে রয়েছে নারী ও শিশুরাও। তাদের কেউ কেউ যৌন সহিংসতা ও নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এই প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে আরাকান আর্মি কোনো বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে এর নেতারা অতীতে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর পরিকল্পিত হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। রাখাইনে রোহিঙ্গা গ্রামবাসীদের ওপর দুটি গণহত্যার অভিযোগও তারা প্রত্যাখ্যান করেছে।

অন্যদিকে, আল জাজিরাকে দেওয়া এক লিখিত বিবৃতিতে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী অভিযোগ করেছে, আরাকান আর্মি রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ উসকে দিচ্ছে এবং রাখাইনের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর থেকে তাদের বিরুদ্ধে ‘গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড’ চালিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে, মিয়ানমারে সহিংসতা ক্রমেই বাড়তে থাকায় এবং এই সংকট বাংলাদেশের সীমান্তে আরও গভীর হওয়ায়, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে শরণার্থীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নিয়ে আসছে।

কিন্তু মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় সেই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আরও কঠিন হয়ে উঠছে।

সংঘাতে সক্রিয় রোহিঙ্গা বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো অবশ্য এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (এআরএসএ)-এর কাছে তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতে চাইলে সংগঠনটি রোহিঙ্গা বেসামরিক নাগরিকদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া, রোহিঙ্গা গ্রামবাসীদের ক্ষতি হয় এমন কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া এবং শরণার্থীদের আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে উৎসাহিত করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

ফাঁস হওয়া নথি, গোপনে ধারণ করা ভিডিও এবং এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে আল জাজিরা অনুসন্ধান করেছে—কীভাবে মিয়ানমারের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ রোহিঙ্গাদের এই প্রায় বিস্মৃত মানবিক সংকটকে আরও গভীর করে তুলছে এবং এর পেছনে কাজ করছে কোন কোন শক্তি।

এই অনুসন্ধানটি ‘Myanmar Exposed’ নামের আল জাজিরা ইনভেস্টিগেটিভসের একটি ধারাবাহিক প্রতিবেদনের অংশ। এই সিরিজে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থান ও পরবর্তী গৃহযুদ্ধের কারণে সৃষ্ট চলমান সংকটের আড়ালে থাকা বাস্তবতা ও অজানা ঘটনাগুলো অনুসন্ধান করে তুলে ধরা হচ্ছে।

Similar Posts